২০১৯ সালের কথা। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে সহপাঠীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ছুটছে, তখন একরাশ অনিশ্চয়তা আর হতাশা সঙ্গী করে গাজীপুরের মাওনায় ভিয়েলাটেক্স টেক্সটাইল স্পিনিং মিলে যোগ দিতে হয়েছিল এরশাদ আলীকে। পদবি ছিল ‘ল্যাব বয়’।
আজ সেই এরশাদ আলী প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি—মেধা তালিকায় অবস্থান ১২তম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯তম ব্যাচের বাংলা বিভাগের এই শিক্ষার্থী মাত্র ২৩ বছর ৮ মাস বয়সেই অর্জন করলেন এই অভাবনীয় সাফল্য।
কারখানার দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত এরশাদ বলেন,
“অন্যরা যখন দিনরাত পড়াশোনার ব্যস্ততায় সময় কাটাত, আমার সময় কেটেছে ল্যাব বয় হিসেবে তুলার বেলের গ্রেডিং, ফ্লোরের তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা চেক করে। আর মাঝে মধ্যে সইতে হয়েছে ডিউটি অফিসারের অকারণ ধমক। রাত কেটেছে চোখের জলে ভেজা বালিশের আর্দ্রতা অনুভব করে।”
ভবিষ্যৎ যেখানে অন্ধকার মনে হচ্ছিল, সেখানে মোড় ঘুরিয়ে দেয় এইচএসসির ফলাফল। জিপিএ ৪.১৭ পেয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান তিনি।
এরশাদ বলেন,
“কখনো ভাবিনি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারব। এইচএসসি রেজাল্টের পর মনে হয়েছিল—আমি হয়তো আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব।”
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। প্রথম সুযোগেই মেধা তালিকায় ২৬তম স্থান অর্জন করে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সের পাঠ চুকানোর আগেই বাজিমাত করেন বিসিএসে। ৬১টি ক্যাডার পদের মধ্যে ১২তম স্থান দখল করে নেন তিনি।
সাফল্যের এই আনন্দময় ক্ষণে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এরশাদ বলেন,
“উত্থান-পতন আর নাটকীয়তায় ভরা জীবনের গল্পটা হয়তো কোনো এক সময় বলা যাবে। আজ গেজেটেড অফিসার হয়ে গেলাম।”
কঠিন পথচলায় পাশে থাকা সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি এই অর্জন নিজের মায়ের প্রতি উৎসর্গ করেছেন তিনি। আবেগভরা কণ্ঠে তিনি যোগ করেন,
“আমার এই অর্জন উৎসর্গ করছি আমার নিরক্ষর অথচ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মাকে।”
সুতার মিলের ল্যাব থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর পেরিয়ে বিসিএসের মঞ্চ—এরশাদ আলীর এই যাত্রা প্রমাণ করে, অদম্য ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে জীবনের যেকোনো কঠিন মোড় থেকেই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।